যুক্তিচিন্তা অথবা ভিক্ষুকের লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক

প্রথম পর্ব

করোনার দিন। ভেঙ্গে গেছে স্বাভাবিক সময়কাঠামো। রাত জেগে কাজ আর দেরিতে জেগে ওঠা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো নেই, নিজের অফিসের জন্য পোশাক পাল্টানো বা জ্যামে বসে ঘেমে ওঠার নাগরিক ছোটাছুটি বন্ধ হয়ে গেছে। নয়টায় ল্যাপটপ খুলে হাজিরা দিলেই চলে।

সব পেশার মানুষের তো এরকম ওয়ার্ক ফ্রম হোম বা তাইরে নাইরে ফ্রম হোম নাই। কাউকে কাউকে জীবন বা পেশার কারণে বাইরে বেরুতেই হয়।

এরকমই এক পেশাজীবীর সুতীক্ষ্ণ সুরচিৎকারে সকালের ঘুম ছুটে যায় প্রায়শই। "থাকতে হবে নিরালায়, একা একা গাছতলায়, চারিদিকে রবে শুধু মাটি" ক্রমাগত বাজতে থাকে তাদের মাইকে। কোন যন্ত্রানুষঙ্গ নেই, একটি চিকন কিন্তু তীব্র কণ্ঠে সদ্য ঘুম থেকে ওঠা মানুষদের তারা অনিবার্য মৃত্যুর গান শোনান। তারা দুজন। একজন অশক্ত অচল প্রবীণ একটি ভ্যানে শুয়ে থাকেন, আরেকজন মধ্যবয়সী তাকে ঠেলে নিয়ে চলেন। যন্ত্রে উচ্চশব্দে ক্রমাগত বাজতে থাকে মৃত্যুর হুমকিসঙ্গীত। তারা মূলত ব্যালকনি থেকে ছুড়ে দেওয়া টাকার জন্য অপেক্ষা করেন।

পোষা হাঁসের ছানার মতো নরম কোমল সকালের ঘুম ছুটে গেলে আমি তাদের নিয়ে ভাবতে শুরু করি। এ যেন নাগরিক নরকের পাতলা দার্শনিকতা।

কেন তারা গান শোনান? কারণ, সুর মানুষকে বেশি আকৃষ্ট করে।

কেন তারা তবে গানের সাথে সুরযন্ত্র ব্যবহার করেন না? কারণ, ইসলাম ধর্মে সুরযন্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ বলে শোনা যায়। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

কেন তারা মৃত্যুর গান শোনান? কারণ, মৃত্যুর কথা মনে আসলে মানুষ অসহায় বোধ করে, মনটা নরম হয়ে আসে। এই ধরনের মানসিক পরিস্থিতিতে জীবনের সবচেয়ে প্রিয়বস্তু টাকা অন্যকে দিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

দুজন, সম্ভবত নিরক্ষর, দরিদ্র ভিক্ষুক তাদের পেশাগত সফলতার জন্য এক‌টি যুক্তিকাঠামো সাজিয়েছেন। এই যুক্তিকাঠামো নিশ্চয়ই তাদের টার্গেট গ্রুপের ক্ষেত্রে কাজও করছে। অর্থাৎ আরও বহু, সম্ভবত শিক্ষিত এবং স্বচ্ছল, মানুষ এই যুক্তিকাঠামো অনুসরণ করেন।

আমাদের প্রতিদিনের নানা কাজে, আচরণে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমরা এরকম নানা ধরনের যুক্তিকাঠামো ব্যবহার করে থাকি। সেসবের কিছু থাকে যুক্তি, কিছু থাকে, নারায়ণগঞ্জের তাজমহলের মতো, যুক্তির চেহারায় ছদ্মযুক্তি বা ফ্যালাসী।

লেখার উৎসাহ বাঁচিয়ে রাখতে পারলে এসব নিয়ে আলাপ আরও আগানো যাবে পরের পর্বে।

২৩ জুলাই ২০২০

১ জনের ভালো লেগেছে