টুয়েন্টি-টুয়েন্টি

মহারাজ বলিলেন, ভাবিয়াছিলাম এই ২০২০ সালটা টুয়েন্টি-টুয়েন্টি খেলিয়া পার করিব।

মন্ত্রী ডগমগ হইয়া বলিলেন, মহারাজ কী ইঙ্গিত করিলেন, আমি বোধহয় বুঝিতে পারিয়াছি।

মন্ত্রীর দিকে কটাক্ষ করিয়া মহারাজ বলিলেন, মন্ত্রী, সবসময় সবকিছু বুঝিতে নাই, বুঝিলেও বালকের ন্যায় উগরাইয়া দেওয়াতে কোনও গরিমা নাই। বুঝিয়াছ?

মন্ত্রী: হুজুর হুজুর।

মহারাজ বলিতে লাগিলেন, আমার পঞ্চরত্নের নতুন রত্ন, কই তিনি, চাঁদবদনখানা একটু দেখি! হু হু, আর দেখিয়া কাজ নাই, মস্তক নত করিয়াই বসিয়া থাকো। তিনি আমাকে কহিলেন, মাতৃভাষা চালু করুন মহারাজ। মাতৃভাষী সেজেছেন! মহান মাতৃভাষী!

চতুর্থ রত্ন স্যোৎসাহে যোগ করিলেন, নতুন মানুষ তো, একটুখানি কাজ-কর্ম না দেখাইলে মন জোগাইবে কী করিয়া? বিশেষ গুনটুন তো কিছু নাই শুনিয়াছি!

মহারাজ বিরক্ত হইয়া বলিলেন, এই তোমাদের এক স্বভাব। সবকিছুতেই নাসিকার অতিরিক্ত অংশটুকু না গছাইলে বিশেষ আরাম হয় না!

চতুর্থ রত্ন বিশেষ লজ্জিত না হইয়াই বলিলেন, হুজুর হুজুর।

যাহা কহিতেছিলাম, ধ্যাত্তরিকা, ভাবটাই বুঝি ছুটিয়া গেল, কেহই আমার কথা শেষ না হইলে অনুমতি ব্যতীত কথা কহিবে না, ইহাই আমার আদেশ।

সমস্বরে সকলেই বলিয়া উঠিলেন, হুজুর হুজুর।

মন্ত্রী বলিলেন, হুজুর টুয়েন্টি-টুয়েন্টি…

মহারাজ স্যোৎসাহে বলিয়া উঠিলেন, মন্ত্রী তোমার গুণ কিছু আছে বটে! মাতৃভাষী মহাশয় আমার টুয়েন্টি টুয়েন্টিকে বর্বাদ করিয়া দিল! আমি অদ্য তাহার উপর স্পষ্টতঃই ক্ষুব্ধ, তাহা আমি এই প্রকাশ্যেই কহিতেছি।

পঞ্চম রত্ন মাথা নত করিয়াই ছিলেন, হাত জোড় করিয়া বলিলেন, অন্যায় যদি কিছু হইয়া থাকে এই সভায় দাঁড়াইয়া ক্ষমা চাহিতেছি। কিন্তু কী বিষয়ে আমি তিরস্কৃত হইতেছি তাহা উপলব্ধি করিতে ব্যর্থ।

মহারাজের মুখমন্ডলে লাল আভার প্রকাশ ঘটিল, চক্ষু ঈষৎ বিস্ফারিত হইল, তথাপি মুহূর্তে দমন করিয়া কিয়ৎক্ষণ স্থির রহিলেন। ইহার পর ধীরলয়ে বলিলেন, অদ্য আমি সিদ্ধান্ত লইয়াছি, ক্রোধ দমন করিব, ক্ষমাই হইবে অদ্যকার সভার প্রধানতম বার্তা। তথাপি, যাহা কিছু সর্বনাশের, যাহা কিছু হানিকর তাহা আমাকে বলিতেই হইবে। সুতরাং রত্ন মহাশয়, তোমার মাতৃভাষা চর্চা কী সর্বনাশ করিয়াছে তাহা তুমি উপলব্ধি করিতে ব্যর্থ হইলেও আমার সহিত বাকী সভাসদগণ নিশ্চয়ই উপলব্ধি করিতে পারিতেছে…।

সকলেই সমস্বরে উচ্চারণ করিল, হুজুর হুজুর।

প্রথম রত্ন হাত জোড় করিয়া বলিলেন, হুজুর বয়স হইয়াছে, তাই মস্তিষ্কও পূর্বের ন্যায় দ্রুত চলিতেছে না। পঞ্চম রত্ন মহাশয় মাতৃভাষা প্রচলন করিবার তাগাদা দেওয়ায় উপকারিতা বিবেচনায় আমরা সকলেই তাহা সুপারিশ করিয়াছিলাম, সেই যুক্তি আপনি মানিয়া লইয়াছিলেন, এক্ষণে কী এমন ঘটিল এই বৃদ্ধের তাহা অবোধ্যই থাকিয়া গেল।

মহারাজ অট্টহাস্যে সভা কম্পিত করিয়া তুলিলেন। সকলের মুখে শূন্য অনুভূতি প্রকাশিত হইল। হাসি সমাপ্ত হইলে বলিলেন, আমার প্রধান রত্নের যদি এহেন দুরবস্থা, তাহা হইলে অন্যবিধ কী আর আশা করিব মহাশয়? এহেন মাতৃভাষা চর্চা কীরূপ ক্ষতিসাধন করিল, তাহা সাম্রাজ্যের মস্তিষ্কখ্যাত এই সভার কেহই উপলব্ধি করিতে পারিল না বলিয়া যারপরনাই আমি বিস্মিত, বিব্রত এবং লজ্জিত!

সবাই মস্তক নত করিয়া বসিয়া রহিলেন। মহারাজ বলিয়া চলিলেন, তোমাদিগের মাতৃভাষা আমার টুয়েন্টি-টুয়েন্টিকে বিশবিশ করিয়া দিল। সেই বিশবিশ এক্ষণে বিষবিষ হইয়া কেমন সাম্রাজ্য জুড়িয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে তাহা দেখিতে পাইতেছ না? মুখোশ পরিধান করিয়া সোশাল ডিসটান্সিং মানিয়া সীমিত পরিসরে কর্ম চালাইতেছি তাহা কী তোমাদের উপলব্ধিতে আসিতেছে না? সাম্রাজ্যের সবকিছুই স্থবির হইয়া পড়িয়াছে, গৃহকোণে থাকিয়া থাকিয়া স্বর্ণালী ক্ষণগুলো কেমন অযথা অপব্যয় হইতেছে তাহা স্বয়ং রাজাকেই আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিতে হইবে?

সকলেই চুপচাপ। শুধু মহারাজের গর্জন তখনও চলিতেছে, বয়স অতিবাহিত হইয়া গেলে প্রথম রত্নের ন্যায় ভাবিতে ভাবিতে বেলা পার হইয়া যাইবে, ভাবনার নোঙ্গর আর ভিড়িবে না, আমার টুয়েন্টি-টুয়েন্টি খেলাও আর জমিবে না।

মহারাজ যেন মনের ভাব প্রকাশ করিতে পারিয়া আরাম বোধ করিতে লাগিলেন, মুখমন্ডলে প্রসন্নতা বিকশিত হইল।

সভাসদগণ তখনও মুখে কুলুপটি আঁটিয়া রহিলেন। মন্ত্রী শুধু কান চুলকাই নাক চুলকাইয়া উসখুস করিতে লাগিলেন। মহারাজ বিষয়টি লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, কী হইল মন্ত্রী অমন মর্কটের ন্যায় ছটফট করিতেছ কেন, যদিও তুমি তাহার তুলনায় কম নহ, কী বলো? হা হা হা হা!

মন্ত্রীর মুখ মুহূর্তের জন্য শুষ্ক হইয়া পড়িল। অন্যান্যরা হাসির একঝটকা হল্লা ছড়াইয়া মজা লইলেন।

কিছু কী কহিতে চাও মন্ত্রী? বিনা দ্বিধায় কহিতে পার। রাজা শুধাইলেন।

হুজুর বলিতেছিলাম কি, টেস্ট সিরিজ তো নানা প্রান্তে শুরু হইয়া গিয়াছে, ওই স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া আর কি, আমরাও আপনার জন্য যদি ওইরকম একটা টুয়েন্টি-টুয়েন্টি সিরিজ আয়োজন করি, স্বাস্থ্যবিধি, সোশাল ডিস্টান্সিং বজায় রাখিয়া, মাতৃভাষা অগ্রাহ্য করিয়া, তবে…।

কিছু গুণের জবাব নাই তোমার মন্ত্রী! রসিক আছ হে! এই কারণেই মন্ত্রী পদে বহাল থাকিয়া তোমার শিকড় গজাইয়া যাইবার পরও মাঝেমধ্যে ইচ্ছা হইবার পরও আর উৎপাটন করিয়া উঠিতে পারি না। বলিয়া খুব হাসিলেন মহারাজ।

হাসি থামিলে আবার বলিলেন, রত্ন মহাশয়গণ, মন্ত্রী মহাশয়ের নিকট আপনাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে, এইবার বোধগম্য হইয়াছে? আর মন্ত্রী, তোমার গুণের তারিফ না করিয়া আমি থাকিতে পারিতেছি না।

হা হা করিয়া হাসিতে হাসিতে মহারাজ বলিলেন, আয়োজন কর আয়োজন কর, একখানা সিরিজ আয়োজন কর, টুয়েন্টি-টুয়েন্টি, আহা! সভা এইখানেই ক্ষান্ত!

সকলেই সমস্বরে বলিল, হুজুর হুজুর! তথাস্তু!!

0 জনের ভালো লেগেছে