আমরা একই গ্রামের মানুষ ছিলাম

ছবিটা ফেসবুকে পোস্ট করার ঠিক আগ মূর্হুতে মনে পড়ল আইনালের কথা। সুপারি গাছের সারির ঠিক নিচে ছিল আইনালের বাড়ি। সে ছিল হাঁপানির রুগি। খুব কষ্ট করে নিঃশ্বাস নিতো। এই শ্বাসকষ্ট বহুগুন বেড়ে যেত রাতের বেলায়। ঘুমের মধ্যে তার নাক ডাকার শব্দ এতটায় তীব্র ছিল যে, বহু দুর থেকে শোনা যেত। গ্রামের ছেলে, বুড়ো সকলেই তার নাক ডাকা শব্দের সাথে পরিচিত ছিল। এমন গল্পও প্রচলিত ছিল, একদিন গভীর রাতে অপরিচিত এক ব্যক্তি এই রাস্ত দিয়ে যাবার সময় আইনালের নাক ডাকার শব্দকে বাঘের গর্জন মনে করে ভয়ে চিৎকার দিয়ে অনেকের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়ে ছিলো।

জন্মগত শ্বাসকষ্ট জনিত শারীরিক অক্ষমতা সত্বেও খুবই আড্ডাবাজ আর প্রাণবন্ত মানুষ ছিল আইনাল। ছেলে বেলায় স্কুলে যাওয়া আসার পথে প্রতিদিন এখানেই দেখা হতো আমাদের। আমি আইনালের নামের সাথে দা যোগ করে আইনাল’দা ডাকতাম। সে কখনও নাম আমার নাম নিতো না। দাদা বলে সস্মোধন করত। প্রায়ই মাথায় হাত বুলিয়ে বলত “দাদা ভালো করে লেখাপড়া করিস, আমরা তো মূর্খ মানুষ কিছুই করতে পারলাম না, তোরা লেখাপড়া করছিস, চাকরি বাকরি করে গ্রামের মুখ উজ্জল করিস।”

কখনও এটা সেটা গল্প করতে করতে স্কুল পর‌্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফিরে আসত, বৃষ্টির সময় কাঁদা পানি মাখা পিচ্ছিল রাস্তাটুকু হাত ধরে পার করে দিত। দাদা নাতির চিরায়ত সস্পর্কের সুত্র ধরে আদি রসাত্বক কথা বলে মজা করত।

আইনাল’দা আমার রক্তের সস্পর্কের কেউ না। তারসাথে আত্নীয়তার কোন বন্ধনও ছিল না। আমরা শুধু একই গ্রামের মানুষ ছিলাম! আইনালদার বাড়িটা এখন আর এখানে নেই। বিশ, পচিশ বছর বা তারও আগে বাড়ি ভেঙ্গে অন্যত্র চলে গিয়েছে।

আইনালদার সাথে শেষ কবে দেখা হয়েছিল মনে নেই। বেঁচে আছে কিনা তাও জানি না। গ্রামে গেলে এখনও এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করি। চেনা পথটাকে নতুন করে আবিস্কার করি। সুড়ঙ্গের ওপারে আলোর রশ্মিরমত নতুন পথের আশাটুকু জাগিয়ে রেখে স্মৃতির গভীর থেকে আইনালদাকে খুজে ফিরি........

১ জনের ভালো লেগেছে