আমার নিজের মুদ্রাদোষে আমি একা হ'তেছি আলাদা?

ইন্দোনেশিয়ায় আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু সুজানা। বাঙলায় জন্মালে নাম হতো সুজন। ওয়েন সুজন তো বটেই, সজ্জনও।

দেশবিদেশে তাঁর শিল্পকর্মের কিছু প্রদর্শনী হয়েছে বটে, কিন্তু মতাদর্শের সাথে বনিবনা হয় না বলে "সভ্যতা" থেকে নির্জন জীবনযাপন করে। চিরকুমারও।

আকারপ্রকার আর শিল্পভাষায় সুজানাকে সুলতানের জাভা মানবিক রূপান্তর বলা যেতে পারে।

বালি দ্বীপে সুলতানের মতোই ছোটখাটো একটা শিল্পকলার স্কুল করেছে শিশুদের জন্য। বাচ্চারা ছবিটবি আঁকে, নিজেও করে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

সুজানাদের সুবাদে ইন্দোনেশিয়ার আরও কিছু মানুষের সাথে পরিচয়। শুরুটা হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার কিছু শিল্পী, জাকার্তার কয়েকটি গ্যালারির কর্তা, শিল্পসংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন আমলাকে দিয়ে। লতায়পাতায় সেটা গিয়ে ঠেকেছে কয়েকজন সংসদসদস্য, রাজনীতিবিদ পর্যন্ত।

২.
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কমিউনিস্ট পার্টিটা ছিল ইন্দোনেশিয়ায়। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগে সমাজতন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ঠাণ্ডা মাথায় গণহত্যা চলেছে যেসব দেশে তার মধ্যে সবচেয়ে জঘন্যতম ইন্দোনেশিয়ায়। বঙ্গবন্ধুর মতোই ইন্দোনেশিয়ার 'জাতির জনক' সুকর্ণকে "হত্যা" করে ক্ষমতায় বসেন জেনারেল সুহার্তো। আমেরিকা আর সুহার্তো মিলে ২০ লাখ মানুষকে হত্যা করে, শুধু কমিউনিস্ট পার্টি করার অপরাধে। সংখ্যাটা এর দ্বিগুণ, এমন দাবি আছে।

তবে সে ঠাণ্ডা লড়াইয়ে সুকর্ণের আরেক পরাজয় অখণ্ড ইন্দোনেশিয়াকে ধরে রাখতে না পারা। তিন বড় দ্বীপ সুমাত্রা-জাভা-ব্রুনেও'র মধ্যে জাভা-সুমাত্রাকে বাঁচাতে পারলেও খনিজ সমৃদ্ধ ব্রুনেও (ইংরেজিতে বোরনেও) দ্বীপটিকে অখণ্ড রাখতে পারেননি। পূবের অংশ স্বাধীন হয়ে যায় ব্রুনেই নামে, উত্তরের অংশ মালয়েশিয়া। আলাদা হয়ে যায় সিংহপুরও (সিঙ্গাপুর)। [সম্প্রতি হলো তিমুরের পূর্ব অংশ।]
ব্রুনেও'র দক্ষিণের অংশটাই এখনো ইন্দোনেশিয়ায় আছে। কালিমন্থন তার নাম।

৩.
ইন্দোনেশিয়ার ৩১ টি প্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রদেশগুলোর একটি কালিমন্তন। কেন্দ্রীয়ভাবে রাষ্ট্রপতিশাসিত বলে প্রাদেশিক সংসদের আইনী ক্ষমতা নেই। কিন্ত স্থানীয় উন্নয়ন থেকে শুরু করে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সবকিছুরই দায় স্থানীয় সরকারের।

কালিমন্তনে এখন ক্ষমতায় গোলকর পার্টি। কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাসীন জোটেরও শরিক তারা। মনে রাখা দরকার, প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর গণতান্ত্রিক পার্টি সংসদের ৫৭৫ আসনের মাত্র ১২৮ টি আসনের মালিক (২২ শতাংশ)। সরকার গঠনের জন্য আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে জোট বাঁধা ছাড়া উপায় নেই।

সেন্ট্রাল কালিমন্তনের রাজধানী পালঙ্ক রায়া আসন থেকে গত নির্বাচনে জিতেছেন অলিভিয়া উইশান্তি।

অলিভিয়ার বাবা ছিলেন আমলা, মা শিক্ষক। ওরা তিন বোন। নিজের ছেলে নেই বলে ওর বাবা-মা একটা এতিম ছেলেকে দত্তক নেন। সেই ছেলে বালিতে অলিভিয়াদের হোটেলটা দেখাশোনা করেন। বলে রাখা ভাল, উত্তরাধিকার সূত্রে খনিসমৃদ্ধ ব্রুনেওতে ভাল সহায়সম্পত্তির মালিক ওরা। নানা ধরনের ব্যবসাবাণিজ্য তো আছেই, দেশিবিদেশের প্রতিষ্ঠিত বেশকিছু ব্রান্ডের রত্নপাথর কোম্পানিতে বিশেষ করে রুবি আর নীলা অলিভিয়াদের খনি থেকেই যায়।

৪.
মান্জা মেরে ঘুরলে তাকে কি আমরা নষ্ট ছেলে বলি? হয়তোবা! বাহাসা (ভাষা)-তে 'আনাক মান্জা' মানে নষ্ট ছেলে। পরিবার-বন্ধু-স্বজনরা অলিভিয়াকে এ নামেই ডাকে। ছোটবেলা থেকেই সে ডানপিটে। পড়াশোনাটাও হয়নি, কোনোমতে ইকোনোমিক্সে এমএ করতে পেরেছে, বাকি ভাইবোনদের সবারই পিএইচডি করা।
সংসদ-সদস্য হওয়ার পরেও অলিভিয়া ত্রিভুজের মতো ঘুরে বেড়ায় পালঙ্ক রায়া - জাকার্তা - বালিতে। ভাইয়ের হোটেলে তাঁর দুদণ্ড শান্তি মেলে।

৫.
করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর লকডাউন চলছে। কিন্তু অলিভিয়াকে ঠেকানো যাচ্ছে না। কাজকর্মে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের থেকে তাকে আলাদা করা কঠিন। খাবার, সচেতনতা, চিকিৎসা দৌঁড়াদৌড়ি দেখলে কেউই বুঝবে না যে সে একজন সংসদ-সদস্য।

এর মধ্যেই গতকাল থেকে তার জ্বর আর ঠাণ্ডা। আজকে করোনাভাইরাস পরীক্ষা হয়েছে। তাতে ফল নেগেটিভ এসেছে। তবে র‍্যাপিড কিটে অনেক সময় সাথে সাথে ধরা পড়ে না, তাই দুদিন পর আবার টেস্ট করাতে হবে।

৬.
অলিভিয়ার সঙ্গে আমার মোটামুটি প্রতিদিনই কথা হয়। আলাপে কমন একটা বিষয়- আমি কবে বালিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করবো। আমার "বন্ধু" সুজানার মতো নিজেও "কিছু একটা" করবো।
এর পাল্টা উত্তরটাও আমার এখন মুখস্থ। বলি, ঠিক আছে, থাকবো, তুমি এলে বালি দ্বীপটা আমরা পায়ে হেঁটে ঘুরবো।
অলিভিয়া বলে, জাকার্তা আর ব্রুনেওতে হেঁটে আমি যথেষ্ট ক্লান্ত। বালিতে আমি আর হাঁটতে পারবো না। বালিতে শুধু ঘুমাবো। তুমি হেঁটে আসার পর একসাথে আড্ডা দিবো।

সেও হাঁটতে রাজি হয় না, আমারও বালিতে থাকা হয় না।

৭.
সম্পদের নিচে থাকে প্রগাঢ় দারিদ্র। ব্রুনেওতেও হাজারো মানুষ লকডাউনে বিপন্ন। তাই ঝুঁকি আছে জেনেও অভুক্ত মানুষ এবং পথের পশুদের কথা ভেবে তাকে বাইরে যেতেই হয়। নিজে যেহেতু নিয়মিত বাইরে যাচ্ছে, তাই পরিবার থেকে আলাদা থাকছে এক মাসের ওপরে। কিন্তু ফেসবুকে তার কর্মকাণ্ডের খবরাখবর ঠিকই চাউড় হয়ে যাচ্ছে।
আজকে করোনা টেস্টের ছবিটাও ছিল, পরে সরিয়ে নিয়েছে। টেস্টের পর তিনটা জনসমাগমে গেছিলো সে। এ নিয়ে পরিবারের সাথে ব্যাপক গণ্ডগোল। মোটামুটি রাতভর এ নিয়ে অনেক মানঅভিমানের কথা শুনতে হলো।

৮.
ক্ষমতাসীন জোটের এমপি হওয়া সত্ত্বেও সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত কথা বলে যাচ্ছে অলিভিয়া। লকডাউনে কৃষক বাঁচাতে সরকারি পদক্ষেপের গাফলতির কড়া সমালোচক সে। ব্যক্তিগতভাবে নিজের সম্পদ অনেকটাই চ্যারিটি করে দিয়েছে, দিচ্ছে। কিন্তু পদ্ধতির পরিবর্তন না হলে একজন মানুষ কতোটাই বা করতে পারে?

৯.
বড়জোর সুজানার মতো "আমার নিজের মুদ্রাদোষে আমি একা হ'তেছি আলাদা?"

--------------------------------------
ঢাকা | ৩০ এপ্রিল ২০২০

১ জনের ভালো লেগেছে

ধন্যবাদ, অনেক তথ্য জানলাম। 

সেই ভাল সরকার প্রধান আসলে সহজে মিলে না! ক্ষমতা মানেই নিজের আখের গোছানো হয়ত!