ক্যালাইডোস্কোপ নিয়ে আমি একটি গল্প লিখতে চেয়েছিলাম

আমি ক্যালাইডোস্কোপ নিয়ে একটি গল্প লিখতে চেয়েছিলাম। মানে, ঠিক ক্যালাইডেস্কোপ নিয়ে না, ক্যালাইডোস্কোপের ভেতরে রাখা একটি জিনিস যেমন অনেকগুলো, প্রায় অনিঃশেষ হয়ে ওঠে, তার সাথে মানুষের আত্ম-ভাবনার মিল তুলে ধরে একটি দার্শনিক টাইপ গল্প লেখার চিন্তা আমার মাথায় আসে। এমন কিছু মানুষকে আমি দেখেছি, যারা নিজেকে নিজের চোখে অনেক বিস্তৃত দেখে, দেখাতেও চায়, যদিও প্রকৃত পক্ষে তারা তা নয়। এ যেন ক্যালাইডোস্কোপের ভেতরে নিজেকে রেখে নিজের চোখেই তা দেখা। আমার আইডিয়াটা দারুণ লাগে। মনে মনে এক ধরনের ওম অনুভব করি-এইবার একটি ভাল গল্প লেখা হয়ে যেতে পারে।

অথচ এই বস্তুটার নাম যে ক্যালাইডোস্কোপ তা আমি মাত্র কয়েকদিন আগেই জানলাম। ক্লাশ থ্রীতে পড়া ভাগ্নে অর্ঘ্য তার সদ্য উপহার পাওয়া বিজ্ঞান বাক্স থেকে জিনিসটি আমাকে দেখানোর সময় এর নাম উচ্চারণ করে। আমি তখনই জানলাম এর নাম ক্যালাইডোস্কোপ। আমি অবশ্য এই বিগত-মধ্যবয়সে এসেও এমন তুচ্ছ একটি খেলনার নাম না জানার হালকা গ্লানি যেন আমাকে ছুঁয়ে না দেয় সম্ভবত সেই অবচেতন সচেতনতার প্রভাবে তার কাছ থেকে প্রথম জানার বিষয়টি প্রকাশ করিনি। এভাবে যে কতবার একটু বুদ্ধি করে, একটু সতর্ক থেকে আমাকে নিজের মর্যাদা রক্ষা করতে হয়েছে!

তখন মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। জুনিয়র কর্মীদের বাম রাজনীতির সবক দিতে আসতেন নেতারা। আমিও স্কুল জীবন থেকেই টুকটাক রাজনীতি করে এসেছি। তো এক রাতের আলাপে, নুরুল আমিন ভাইর রুমে, ড্রামাটিক্সের কবীর ভাই সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরে সুপারস্ট্রাকচারের ভূমিকা নিয়ে জ্ঞান বিতরণ শুরু করলে আমার পেটের ভেতর বস্তুবাদ বিষয়ে আগেই দু-চারটা বই পড়ে ফেলার অহম গুড়গুড় করতে শুরু করে। আমি সুপারস্ট্রাকচারের বিপরীত হিসেবে ধরে নিয়ে ‘বেসিকস্ট্রাকচারের’ বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ যুক্তিতর্ক চালিয়ে যাই। কবীর ভাই মোটমুটি একমত হন এবং আমার ওপর, সম্ভবত, কিঞ্চিৎ অধিক আস্থা নিয়ে ফিরে যান। আজ আর স্বীকার না করেই বা কী লাভ, আমার জীবনে সুপারস্ট্রাকচার শব্দটি সেদিনই প্রথম শুনেছি এবং পরবর্তীতে দুয়েকটি বই ঘেঁটে দেখলাম যে, আমার সে দিনের বক্তব্যের মূল রাস্তা ঠিক থাকলেও, পদটি ‘বেসিকস্ট্রাকচার’ নয়, সাধারণত ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। আজকে মনে হচ্ছে, ওই দিনের বিষয়টি আমার নিজেকে ক্যালাইডোস্কোপের ভিতর দিয়ে দেখানোর মতই একটি ঘটনা ছিল। 

আমি অবশ্য নিজেকে নিয়ে না, আমার চেনা অন্য কয়েকজনকে নিয়ে ক্যালাইডোস্কোপের গল্পটি লিখতে চেয়েছিলাম!

ক্যালাইডোস্কোপ আমি প্রথম দেখি ক্লাশ নাইনে থাকতে। আমার থেকে বয়সে কয়েক বছরের বড় সে সময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কিসলু ভাই নিজ হাতে কাঁচের টুকরা জোড়া দিয়ে একটি ক্যালাইডোস্কোপ বানিয়েছিলেন, যেটি পরে অনেকদিন আমার কাছেই ছিল। তখন অবশ্য জিনিসটির নাম জানার কথা মনে আসেনি। ওতে তখন কাঁচের চুড়ির ভাঙা টুকরা দেখে আমরা বিস্মিত হতাম। সে সময় আমার কবিতার দোষ ছিল, গল্প লেখার চিন্তা একেবারেই মাথায় ছিল না।

সম্প্রতি গল্প লিখলে ছাপা হওয়ার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তাছাড়া, উল্টো দিক থেকে জীবন দেখার পদ্ধতিতে গত কয়েক বছরের চেষ্টায় অনেকটা অভ্যস্ত হয়েছি। আগে যেমন সবচেয়ে উঁচুর সাথে মিলিয়ে নিজেকে মাপতে চাইতাম, এখন আর তেমন করি না। পেছনের মানুষটির সাথে তুলনা করলে বরং নিজের অগ্রসর অবস্থা চোখে পড়ে। নইলে কতকাল আর নিজেকে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় দেখতে ভাল লাগে! তাই দেখার চোখটা বদলে নিলাম! ফলে আজকাল বেশ স্বচ্ছন্দেই এটা-ওটা লিখে ফেলা যাচ্ছে-লেখার মান নিয়ে কল্পিত বিব্রতবোধ আর কলম চেপে ধরছে না। এর মধ্যে দুয়েকজন মমতাবান বন্ধুও পাওয়া গেছে, যারা কিছুটা উৎসাহও দেন। অন্তত লেখা কেমন লাগছে জানতে চাইলে ভাল না বলে ফেরান না! তাই ভাবছিলাম, দার্শনিক-মনস্তাত্ত্বিক ধাচের গল্পটি লিখে ফেলতে পারলে, বলা যায় না, নিজে থেকে জানতে না চাইলেও হয়ত কেউ কেউ লেখাটা ভাল লেগেছে বলে জানাবে। এ জন্যই আমি ক্যালাইডোস্কোপ নিয়ে গল্প লেখার কথা ভাবছিলাম।

ক্যালাইডোস্কোপ নিয়ে গল্প লেখার কথা ভাবতে ভাবতেই আমার বাবার কথা মনে পড়ে। খুব ছোট বেলায় যখন গ্রামে আমাদের নিজেদের বাড়ি ছিল, হারিকেনের আধোছায়া রাতে মা পাশের ঘরে রান্না করত, আমরা তিন ভাইবোন বাবার কোলে-পাশে বসে গল্প শুনতাম। বাবার পিঠে কান লাগিয়ে শরীরের শব্দ শোনা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় শ্রবণ-অনুভূতি। তখন পর্যন্ত সবার ছোট হওয়ার সুবাদে বাবার কোলে আমিই বেশিরভাগ সময় জায়গা পেতাম। উঠানের ওপারে জোনাকির ঝাঁক, ঝিঁ ঝিঁ’র ডাক, বকুল গাছের আড়ালে ভূতেদের অনিশ্চিত অনুপস্থিতির শিহরণ আর পাশের বাড়ির তটিনীদের ফুল বাগান থেকে আসা হাস্নাহেনার সুবাসের সাথে গলাগলি বসে আমরা বাবার বলা গল্প শুনতাম। বাবা আওরঙ্গজেব-হুমায়ুন থেকে নৌকাডুবি, গান্ধীজির চরকা থেকে যিশুখ্রীষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ বা মহাভারতের গল্প শোনাতেন।

বাবা একবার জানিয়েছিলেন, ঈশ্বর বললেন, “একঃ অহং, বহু শ্যামঃ-আমি এক, কিন্তু বহু হব”। বাবার মৃত্যুর ত্রিশ বছর পরে ঈশ্বরের সেই ইচ্ছা প্রকাশ আমার ক্যালাইডোস্কোপের গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়তে চায়। তবে কী এই বিশ্বজগত ঈশ্বরের এক বিশাল ক্যালাইডোস্কোপ, যাতে তিনি নিজেকে বহু দেখেন! আমরা অবশ্য সেই শৈশবে ঈশ্বরের মাহাত্ম্য নিয়ে ভাবিত ছিলাম না। আমরা অভিভূত হয়ে বাবাকে দেখতাম। বাবার ছয়ফুট উচ্চতার ঋজু দেহ, চওড়া বুকের ছাতিতে আমরা অনায়াসে এটে যেতাম। বাবার বলা গল্প আসলে আমাদের বিশাল বিশ্বের বিস্ময় নিয়ে বাবাকেই দেখাত। বাবা যেন ছিল আমাদের শৈশবের ক্যালাইডোস্কোপ।

এইসব নানা ভাবনা আমার ক্যালাইডোস্কোপের গল্পের ভেতরে যাতায়াত করতে থাকে। শৈশবের রঙিন কাঁচের চুড়ির ভাঙা টুকরার মতো বিচিত্র রঙে অনিঃশেষ বিচ্ছুরণের মতো আমার গল্পের ক্যালাইডোস্কোপ নিজেই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। আমি আর গল্পটাকে বাগে আনতে পারি না, যদিও ক্যালাইডোস্কোপ নিয়ে আমি একটি গল্প লিখতে চেয়েছিলাম।

১ জনের ভালো লেগেছে

ক্যালাইডোস্কোপের মুল অর্থ কি তা নিয়ে আমি অনেক ক্ষন এদিক সেদিক ঘুরে এলাম, লেখা থেকে ধারনা পেলেও এর সঠিক অর্থ খুঁজে বের করতে চেষ্টা করছিলাম। 

ধন্যবাদ আপনাকে, আমাদের ছোট বেলার কথা মনে করিয়ে দেয়ার জন্য।  ক্যালাইডোস্কোপ নিয়ে গল্পটা কিন্তু এখনো লেখা হত নাই! হা হা হা... 

অনেক ধন্যবাদ, উদরাজী ভাই। এইটা আসলে গল্প না, লিখে উঠতে না পারা এক অগল্প!
নিয়মিত আপনার লেখা পড়তে চাই!